কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের গোবরিয়া জাব্বাপাড়ায় ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শাহাবুদ্দিন মেম্বার এখন বিএনপির পতাকা গায়ে লাগিয়ে এলাকায় নতুন করে তাণ্ডব চালাচ্ছেন। সরকার বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি এই সন্ত্রাসী চক্রের চেহারা; বরং নতুন রাজনৈতিক মুখোশ পেয়ে তারা আরও উৎপাতী, আরও বেপরোয়া ও আরও দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। জমি দখল, সরকারি সম্পত্তি লুট, রাস্তা বন্ধ, মিথ্যা মামলা, নারী নির্যাতন, হত্যার হুমকি এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা – এসব যেন তাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে এই পরিবার এখন ‘সন্ত্রাসের প্রতীক’। ভয়ে কেউ মুখ খোলে না, খুললেই পড়তে হয় মৃত্যুফাঁদে।
শাহাবুদ্দিন মেম্বার এলাকার বুকে এমন এক তাণ্ডব চালাচ্ছেন যা কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্যকেও হার মানায়। তিনি কেবল জমি দখল করেন না, তিনি দখল করেন মানুষের স্বপ্ন, মানুষের চলাচলের পথ, মানুষের বাঁচার অধিকার। তাঁর ছোট ভাই হারুন ও বাদল – যারা শাকিল হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি – তাদের তিনি ব্যবহার করেন অস্ত্র হিসেবে। এই দুই ভাই এলাকায় ঘোরাফেরা করে মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখে। শাকিল হত্যাকাণ্ডের পর তারা শাকিলের মাকেও হত্যার চেষ্টা চালায়, যাতে মামলার সাক্ষী জড়ো না হয়। কিন্তু বুরহান নামে এক সাহসী ব্যক্তি সেই নারীকে উদ্ধার করেন; নইলে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে যেত।
শাহাবুদ্দিন শুধু প্রতিপক্ষকেই নয়, নিজের ভাই জিল্লুকেও রাজনৈতিক শত্রু ভেবে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছেন। জমি দখল, অপবাদ, হুমকি – সবকিছুর শিকার হয়েছেন নিজের রক্তের মানুষও। ভাই বলতে তাদের কাছে কিছুই নেই; আছে শুধু ক্ষমতা আর সম্পদ লুটের প্রবল লোভ।
শাহাবুদ্দিনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কৌশল হলো তার তথাকথিত ‘দরবার’। তিনি এলাকার মানুষকে ডেকে বসান, যেখানে বিচার নয়, হয় তার ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া। যদি কেউ তার জমি দখলের প্রতিবাদ করে, তাকে ডেকে এনে দরবারে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, তাকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয় এবং যদি প্রয়োজন হয়, তাকে শারীরিক নির্যাতনের হুমকিও দেওয়া হয়। এই দরবারগুলোতে কোনো আইন মানা হয় না, মানা হয় শুধু শাহাবুদ্দিনের নির্দেশ। এলাকাবাসী বলছেন, এই দরবারগুলো তাদের কাছে ‘ভয়ঙ্কর রাতের নাম’। কে কখন ডাক পায়, কে কী শাস্তি পায় – তা কেউ জানতে পারে না।
শাহাবুদ্দিনের মেয়ে কুলসুম বেগম যেন পিতার চেয়েও বেশি সন্ত্রাসী। বাবার সহায়তায় তিনি সরকারি জমি দখল করে বসেছেন। তিনি এলাকার একমাত্র সরকারি রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন নিজের দখলে। সেই রাস্তায় মাটি ভরাট করে বসেছেন তিনি – যেন রাস্তাটি তার পৈত্রিক সম্পত্তি। এলাকার মানুষ বলছেন, “আমাদের চলাচলের একমাত্র পথ বন্ধ; রাস্তা পেরুতে গেলে অপবাদ শুনতে হয়, হুমকি শুনতে হয়।” কুলসুম বেগম প্রতিবাদী মানুষকে ‘মাদকাসক্ত’, ‘চরিত্রহীন’, ‘উচ্ছৃঙ্খল’ – নানান অপবাদ দিয়ে তাদের সামাজিকভাবে শেষ করে দেন। ছোটন নামে এক যুবককে তিনি মাদকাসক্ত বলে অপবাদ দিয়ে রাস্তা ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। এটা শুধু একটি রাস্তা দখল নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার লুটের ঘটনা।
কুলসুম বেগমের সন্ত্রাসের তালিকা কেবল সরকারি সম্পত্তি দখলেই শেষ নয়। তিনি শ্বশুরবাড়িকেও জিম্মি করেছেন। প্রবাসী স্বামী বকুলকে কাজে লাগিয়ে ভাসুর রতন মিয়ার সম্পত্তি দখলের পরিকল্পনা করছেন তিনি। নিজের ছোট ভাই নুর আলম দিয়ে স্বর্ণালংকার চুরি করিয়ে সেই দোষ চাপিয়েছেন দেবরের স্ত্রীদের ওপর। বকুলের ভাইয়েরা এখন নিজের বাড়িতেই পরবাসী – তারা মুখ খুলতে পারেন না, ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। কুলসুমের সন্ত্রাসে বকুলের গোটা পরিবার বিপর্যস্ত। তিনি নিজের স্বামীকে সম্মান দিতে অস্বীকৃত – কারণ ক্ষমতাই তার কাছে প্রধান।
শুধু তাই নয়, কুলসুম তার নিজের সন্তানদেরও ব্যবহার করেছেন অরাজকতা ছড়াতে। ৫ আগস্টের আগে তিনি তার মেয়েকে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) নেতার ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে বিয়ের চাপ দিয়েছিলেন – যা ব্যর্থ হলে ছোট ছেলেকে অন্য একটি প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের ফাঁদ পেতে বিয়ে করাতে বাধ্য করেন তিনি কোরবানির ঈদের পরপরই। এদের কাছে সংসার, সন্তান, স্বামী সবই হাতিয়ার – শুধু ক্ষমতা আর সম্পদই লক্ষ্য।
শাহাবুদ্দিন পরিবারের সবচেয়ে জঘন্য কাজ হলো সরকারি রাস্তা দখল। এই রাস্তা শুধু চলাচলের পথ নয় – এটি কৃষকের জমিতে যাওয়ার পথ, জেলেদের মাছ ধরার পথ, শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথ। বর্ষায় বিলে পানি এলে জেলেরা এই পথে মাছ ধরতে যেতেন। কৃষকেরা ফসল আনতে এই পথ ব্যবহার করতেন। কিন্তু কুলসুম বেগম সেই পথে মাটি ভরাট করে বসেছেন। এখন এলাকাটি একটি বন্দীশালায় পরিণত হয়েছে। মানুষ নিজেদের বাড়িতে আটকা পড়ে আছে। ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলেছেন, “আমরা কি মানুষ নই? আমরা কি বাঁচতে চাই না? আমরা কি শুধু দম বন্ধ করে মরব?”
এলাকায় বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। ক্যামেরার সামনে, মাইক্রোফোনের সামনে কেউ কথা বলতে চায় না। এমনকি স্থানীয় সাংবাদিকরা পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়েছেন। এলাকাবাসী বলছেন, “আমরা মুখ খুললেই হারুন-বাদল আমাদের শেষ করে দেবে। তারা শাকিলকে যেমন হত্যা করেছে, আমাদেরও তেমন হত্যা করবে।” শাহাবুদ্দিনের পক্ষে কেউ কথা বললে পুরস্কার, আর বিপক্ষে গেলে শাস্তি – এই ব্যবস্থায় এলাকার মানুষ স্তব্ধ হয়ে আছে। কয়েকজন সাহসী ভুক্তভোগী গোপনে গণমাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন; কিন্তু তাঁরা নাম প্রকাশ করতে রাজি নন – কারণ জীবন সংশয়।
৫ আগস্টের আগে শাহাবুদ্দিন ও তার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। এখন তারা বিএনপি পরিচয়ে নিজেদের ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এটা তাদের অপকর্মের নতুন ফর্ম। রাজনীতি বদলালেও তাদের মুখোশ বদলায় না; বরং তারা আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, “এরা কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এরা সন্ত্রাসী চক্র। এদের রাজনীতি মানে দখল, লুট, আর নির্যাতন।” রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই সন্ত্রাসীদের থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখা, নয়তো জনগণ দলগুলোকেও প্রশ্ন করবে।
এই সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী বারবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু প্রশাসনের নীরবতা তাদের আরও শক্তি দিয়েছে। থানা পুলিশকে কেউ খুঁজলে তারা এলাকায় প্রবেশ করতে চায় না – এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের কাছেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে জবাব মেলেনি। এলাকাবাসী প্রশ্ন তোলেন, “এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কী কোনো আইন নেই? তাঁদের ক্ষমতার কাছে কি আইন হার মানে?” জনপ্রশাসন যদি এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে এলাকার মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার আশঙ্কা করছেন।
এলাকাবাসী সরকার ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন –
স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “আমরা আর পারছি না। দিনে দিনে আমাদের জীবন সংকুচিত হচ্ছে। প্রশাসন যদি না বোঝে, তাহলে আমরা কে শুনবে? আমরা চাই শান্তি, আমরা চাই চলাচলের পথ, আমরা চাই বাঁচার অধিকার।”
এটি কোনো সাধারণ পারিবারিক বিরোধ বা এলাকাবাসীর অভিযোগ নয় – এটি সংগঠিত সন্ত্রাস, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুট, এটি সাধারণ মানুষের ওপর নারকীয় অত্যাচার। শাহাবুদ্দিন মেম্বার ও তার পরিবার এলাকার বুকে যে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তা কোনো রাজনৈতিক দল বা স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। এই সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা যাঁরা করেন, তাঁদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জনধারা নিউজ মনে করে – এই ঘটনা এখন আর আঞ্চলিক নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এক জেলার এক প্রান্তে যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তবে তা গোটা দেশের জন্য হুমকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। নয়তো সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবে আইনের প্রতি, আর তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আমরাও চাই এই, শাহাবুদ্দিন মেম্বারের সন্ত্রাসী চক্রকে আজই আইনের আওতায় আনুন। রাস্তাটি খুলে দিন। এলাকাবাসীকে মুক্তি দিন। এই জনপদে ফিরিয়ে দিন শান্তি আর স্বস্তি।