বাংলাদেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে আগের মতো কোনো রাজনৈতিক ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ করতে চায় না বিএনপি। অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সরকার ও দলের সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঝুঁকি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী বাছাইয়ে এবার অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবেই বিষয়টি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে, তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্তে যেতে রাজি নয় দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এক দিনের বিষয় নয়, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি, তাই এবার ভুলের সুযোগ রাখতে চায় না দল।দলীয় সূত্রগুলো জানায়, বাইরে যত আলোচনা-জল্পনা থাকুক, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে—সেই সিদ্ধান্ত এখনো সীমিত কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্ভাব্য কয়েকটি নাম নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি এবং প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দিক থেকে মতামত নিচ্ছেন। আগামী শনিবার (১ আগস্ট) দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে, সেখানে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে, সেই বিষয়ে আলোচনা হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা খুবই কম। রাজনৈতিক অঙ্গনে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আব্দুল মঈন খানের নাম নিয়ে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, এ মুহূর্তে যেসব নাম আলোচনায় রয়েছে, তার কোনোটিই চূড়ান্ত নয় এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিদিন বদলাচ্ছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সব বিকল্প খোলা রাখা হয়েছে। তবে, রাজনীতিতে একজন পরিচ্ছন্ন, মার্জিত এবং ‘স্বজ্জন ব্যক্তি’ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ও সমাদৃত মির্জা ফখরুল এই পদের জন্য এগিয়ে রয়েছেন বলেও জানা যায়।রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তবে জাতীয় স্বার্থে এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করা প্রয়োজন, যিনি কেবল দলীয় আনুগত্য নয়, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার জন্যও গ্রহণযোগ্য। বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হলে একাধিক সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক পদে পরিবর্তন আনতে হবে, তাই মন্ত্রিসভার বাইরে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যের নামও বিবেচনায় রয়েছে। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, যদি বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে মন্ত্রিসভায় রদবদল প্রয়োজন হবে, একইভাবে বিএনপির মহাসচিব রাষ্ট্রপতি হলে দলেও নেতৃত্বের পরিবর্তন অনিবার্য হবে এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকেই স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতি করা হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার পদেও পরিবর্তন আনতে হবে। এবার প্রার্থী বাছাইয়ে সাংবিধানিক বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ব্যক্তিগত সততা ও বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা ও জাতীয় সংকটে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখার সক্ষমতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলটির একজন যুগ্ম মহাসচিব বলেন, রাষ্ট্রপতি এমন একজন হতে হবে, যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’কে এবং ভবিষ্যতে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারেন, এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি করার ঝুঁকি নিতে চায় না দল। একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, যোগ্যতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আস্থা, রাষ্ট্রপতির পদে এমন কাউকে বসানো যাবে না, যিনি ভবিষ্যতে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারেন কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়ান। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই চূড়ান্ত হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও বলেছেন, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামই রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্ত এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষা করতে হবে নতুন রাষ্ট্রপতির নাম জানতে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, তবে আগস্টের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহেই এই নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনাও সরকারের উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।