
রাতের অন্ধকারে জোনাকি পোকার ঝিকিমিকি আলো এখন এক বিরল দৃশ্য। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৫% জোনাকি পোকার প্রজাতি মারাত্মক বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাসস্থান ধ্বংস, অত্যধিক কৃত্রিম আলো ও রাসায়নিক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন এই মায়াবী পোকাটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, আমরাই হয়তো পৃথিবীর শেষ প্রজন্ম যারা রাতের অন্ধকারে প্রকৃতির এই অনন্য আলোর খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ পাচ্ছি।
জোনাকি কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জোনাকির লার্ভা ক্ষতিকারক শামুক ও পোকা-মাকড় খেয়ে ফসলের সুরক্ষা করে। তাই জোনাকি বিলুপ্ত হলে সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের হুমকিতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং বিভিন্ন দেশের কীটতত্ত্ববিদদের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, মূলত মানুষের তৈরি তীব্র কৃত্রিম আলোক দূষণ, বিশ্বব্যাপী কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংসের কারণেই এই নিশাচর পতঙ্গটি দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটি ও ঘন ঝোপঝাড় এবং বনাঞ্চল ছাড়া জোনাকিরা বংশবৃদ্ধি করতে বা বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু বর্তমান নগরায়ণের ফলে তাদের এই নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলো প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে। রাতের শহরের অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো জোনাকিদের নিজস্ব রাসায়নিক আলোর কার্যকারিতা নষ্ট করে দিচ্ছে, যার ফলে এরা অন্ধকারে নিজেদের সঙ্গী খুঁজে পেতে এবং বংশবিস্তার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে এখন জোনাকির আলো প্রায় দেখাই যায় না। কেবল চট্টগ্রাম এবং হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কিছু পাহাড়ি এবং গ্রামীণ বনাঞ্চলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এদের অস্তিত্ব টিকে আছে। এই ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী ইতিমধ্যে জোনাকিদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিপন্নপ্রায় বন্যপ্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জোনাকি বিষয়ক ৩৫০ জন বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের ভিত্তিতে গবেষকরা নির্ধারণ করেছেন যে, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং কৃষিকাজের নিবিড়করণের মতো কারণগুলোর দ্বারা সৃষ্ট আবাসস্থলের ক্ষতি এবং খণ্ডীকরণই হলো প্রধান হুমকি। ম্যাসাচুসেটসের টাফটস ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সারা লুইস বলেন, আলো দূষণ অনেক নিশাচর প্রাণীকে প্রভাবিত করে, কিন্তু জোনাকিরা এই বিশেষ হুমকির প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
এই সংকট দূর করতে বিশ্বজুড়ে এখন ‘ফায়ারফ্লাই অ্যাটলাস’ (Firefly Atlas)-এর মতো নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্প চালু হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ জোনাকির অবস্থান ট্র্যাকিংয়ে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের করণীয় হলো— রাতে বাড়ির চারপাশের অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো বা ফ্লাডলাইট বন্ধ রাখা, বাগানে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করা এবং ঝোপঝাড় বা ভেজা পাতার প্রাকৃতিক স্তূপ পুরোপুরি পরিষ্কার না করে জোনাকির জন্য কিছুটা প্রাকৃতিক আবহাওয়া বজায় রাখা। প্রকৃতির এই মায়াবী পতঙ্গকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে।