
রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। শতকোটি টাকার পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণব (৩৪) খুন হয়েছেন, নাকি তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহননের পথে—এখনো খোলেনি এই রহস্যের জট। গত ২ মে দুপুরে ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১ তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয় অর্ণবের। প্রাথমিকভাবে ধানমন্ডি থানায় এটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়, তবে নিহতের মা হালিমা খাতুন ১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন। ২০১৬ সালে বয়স জালিয়াতির অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় কারাবরণ করেন এবং ২০১৭ সালে হৃদরোগে আকস্মিক মৃত্যু হয় তার। তিনি রেখে যান বিপুল সম্পত্তি—ধানমন্ডি, সেগুনবাগিচা, উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও বাড়ি, কিশোরগঞ্জে স্কুল-কলেজ, প্রায় একশ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি। এই সম্পত্তি নিয়েই শুরু হয় পারিবারিক কোন্দল।
বাবার মৃত্যুর পর অর্ণব যখন পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ নেন, তখন চাচা ওসমান গনি, জাহেদ ও হারুনসহ কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এমনকি সম্পত্তি বিক্রিতেও তাকে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। অর্ণবের মামা মোতাহার হোসেনের অভিযোগ, রফিকুল ইসলামের ভাইবোনরা হালিমাকে পরিবারে কোণঠাসা করে এবং সম্পত্তির স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী অর্ণবকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও অপমান করে। অর্ণবকে তার চাচা ওসমানের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে অর্ণব নিরাপত্তার শঙ্কায় খালার বাসায় আশ্রয় নেন এবং পরদিন মাকে পুরো ঘটনা জানান।
মৃত্যুর দুদিন আগে অর্ণব ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ইমেজিং সেন্টারে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়েছিলেন। তার সন্দেহ ছিল, বাসার গৃহকর্মীদের মাধ্যমে তাকে খাবারে মাদক বা চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। পরীক্ষার রিপোর্টে ক্যানাবিনয়েডস, ওপিয়েটস, বেনজোডায়াজেপিন, কোকেইন ও অ্যাম্ফিটামিন—পাঁচটি প্যারামিটারের ফলাফলই নেগেটিভ আসে।
অর্ণবের মা দায়ের করা মামলায় তিন চাচা-ফুফুসহ মোট ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ, আসামিরা সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে অর্ণবকে বাধা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত পরস্পর যোগসাজশে তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমেও তাকে ঘুমের ওষুধ বা অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ। ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে বলে দাবি বাদীর। মামলার প্রধান আসামি ওসমান গণি বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং পুলিশি তদন্তের কথা জানান। তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার এসআই আব্দুল করিম জানান, প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।