
“Peace cannot be kept by force; it can only be achieved by understanding.”
— Albert Einstein
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলছে, সাম্রাজ্য বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, জোট বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় কখনো বদলায়নি, আর সেটি হলো শক্তির প্রতিযোগিতা। আজও বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন জোট গড়ছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, অস্ত্র বিক্রি করছে এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলছি, যেখানে শান্তি একটি ব্যতিক্রম আর সংঘাত একটি স্বাভাবিক ঘটনা?
“The supreme art of war is to subdue the enemy without fighting.”
— Sun Tzu, The Art of War
প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, যুদ্ধও তত জটিল হয়েছে। আজ একটি সংঘাত শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পৌঁছে যায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে, খাদ্যের দামে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনে। একটি অঞ্চলের যুদ্ধ অন্য অঞ্চলের শিশুর খাদ্য, শিক্ষার্থীের ভবিষ্যৎ কিংবা শ্রমিকের কর্মসংস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক রাষ্ট্র সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক সত্য হলো, স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, স্থায়ী হয় জাতীয় স্বার্থ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ যদি মানবিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা হয়, তবে সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ইতিহাসে এমন বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, যারা ক্ষমতাকে ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিল।
“Injustice anywhere is a threat to justice everywhere.”
— Martin Luther King Jr.
বিশ্ব রাজনীতিতে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং সার্বভৌমত্বের নীতি যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তাহলে বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শুধু ছোট রাষ্ট্রের জন্য নয়, বড় শক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্যও অপরিহার্য।
একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, দক্ষ কূটনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর শক্তি। যে দেশ জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং উৎপাদনে এগিয়ে থাকবে, আগামী বিশ্বের নেতৃত্বও তার হাতেই যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
একজন মুসলিম হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ব রাজনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায় ও মানবিকতা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
— সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮
এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। শক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ন্যায়বিচার ছাড়া সেই শক্তি স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না।
আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অস্ত্রের সংখ্যা নয়, বরং নেতৃত্বের মান। পৃথিবীর প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা সংঘাতকে নয়, সংলাপকে গুরুত্ব দেবে; বিভাজন নয়, সহযোগিতার পথ বেছে নেবে; এবং ক্ষমতার চেয়ে মানবতার মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দেবে।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত অস্ত্রের শব্দকে নয়, ন্যায়বিচারের কণ্ঠস্বরকেই দীর্ঘদিন মনে রাখে।
লেখক: শাহনুর আলম, চেয়ারপার্সন – পেট্রোরি ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন