
মানুষের অন্তরে লোভ একটি গভীরভাবে প্রোথিত প্রবৃত্তি। এটি তাকে কখনো স্থির হতে দেয় না, সবসময় ‘আরও’ পাওয়ার জন্য ছোটায়। অথচ এই লোভ-লালসাই মানুষকে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে দেয়, তার বিবেক ও আত্মাকে বিকিয়ে দেয় এবং পরিণতিতে তাকে নিয়ে যায় চিরস্থায়ী ক্ষতির দিকে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে লোভের এই মর্মান্তিক পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা ও কঠোর সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে।
কুরআনের ভাষায় লোভের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আল্লাহ বলেন:
“أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ – حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ”
“বেশি বেশি পাওয়ার লোভ তোমাদেরকে আমৃত্যু মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।”
(সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত: ১-২)
এই আয়াতে আল্লাহ মানুষের সেই চিরন্তন প্রবৃত্তির কথা তুলে ধরেছেন যা অল্পে তুষ্ট হয় না, ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়েও বেশি পাওয়ার নেশায় জীবনকে নষ্ট করে দেয়। মানুষ জানে যে সে প্রয়োজনের বেশি খেতে পারে না, পরতে পারে না, তবুও প্রাচুর্যের পেছনে ছুটে তার মূল্যবান জীবনকে উজাড় করে দেয়।
লোভ-লালসার কারণে মানুষ স্বার্থের পেছনে অন্ধ হয়ে আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে যায় এবং তার বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে। আল্লাহ বলেন:
“إِنَّ الْإِنسَانَ لِرَبِّهِ لَكَنُودٌ – وَإِنَّهُ عَلَىٰ ذَٰلِكَ لَشَهِيدٌ – وَإِنَّهُ لِحُبِّ الْخَيْرِ لَشَدِيدٌ”
“নিশ্চয়ই মানুষ তার পালনকর্তার প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ; আর সে নিজেও তার সাক্ষী; আর সে ধন-সম্পদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত।”
(সূরা আল-আদিয়াত, আয়াত: ৬-৮)
আল্লাহ আরও বলেন:
“وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ”
“আর তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।”
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
এই আয়াতে শুধু চুরি-ডাকাতি বা সুদ-ঘুষ নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং যে কোনো প্রকার প্রতারণা, মিথ্যা মামলা বা অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ হরণ করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিয়ামতের দিন এই সম্পদের জন্য কঠিন জবাবদিহি করতে হবে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) লোভের ব্যাপারে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে:
“لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ ذَهَبٍ لأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ ثَالِثٌ، وَلاَ يَمْلَأُ فَاهُ إِلاَّ التُّرَابُ”
“আদম-সন্তানের যদি দুটি উপত্যকা পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, তবুও সে তৃতীয়টির কামনা করবে। মাটি ছাড়া আর কিছুই তার মুখ পূর্ণ করতে পারবে না।”
(সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২৩৩৭)
আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন:
“يَهْرَمُ ابْنُ آدَمَ، وَيَشِبُّ مَعَهُ اثْنَتَانِ: الْأَمَلُ، وَحُبُّ الْمَالِ”
“মানুষের বয়স বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তার সঙ্গে দুটি জিনিস যৌবনে থাকে: দীর্ঘ আশা এবং ধন-সম্পদের ভালোবাসা।”
কুরআন ও হাদিস থেকে শিক্ষা:
১. লোভ মানুষকে অন্ধ করে: লোভ-লালসা মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিকে স্তব্ধ করে দেয়, ফলে সে সঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে পারে না এবং অন্যায়ের পথে পা বাড়ায়।
২. লোভ ধ্বংস ডেকে আনে: লোভের কারণে মানুষ অন্যের অধিকার হরণ করে, সম্পর্ক নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. লোভ মানুষের আত্মাকে নিঃস্ব করে: লোভী মানুষ কখনো শান্তি পায় না; তার তৃপ্তি হয় না, বরং সে চিরদিনের জন্য আত্মিক শূন্যতা ও অনিশ্চয়তায় ভোগে।
৪. আখেরাতের শাস্তি: যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রাস করে বা মিথ্যা শপথ করে সম্পদ হরণ করে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে এবং তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
৫. লোভ থেকে বাঁচার উপায়: হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকা, আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং ধৈর্য ধারণ করাই হলো লোভ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।
লোভ মানুষের জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে; এটি তাকে দুনিয়ায় যেমন নিঃস্ব করে, তেমনি আখেরাতেও তার কোনো পুঁজি রাখে না। এই মরণব্যাধি থেকে নিজেদের বাঁচাতে হলে আমাদের প্রত্যেককে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করতে হবে এবং সন্তুষ্টি ও আল্লাহর রিজিকের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
লেখক: শাহনুর আলম, চেয়ারপার্সন – পেট্রোরি ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন