
ভেবেছিলেন রাষ্ট্রপতিরা দায়িত্ববান, সংযত, কূটনৈতিক হন? ডোনাল্ড ট্রাম্প সেসব ভ্রম গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর হাতে যুক্তরাষ্ট্র যেন এক বিশাল টুইটার অ্যাকাউন্ট, আর তিনিই তার একমাত্র অ্যাডমিন। তিনি যা বলেন, তাই আইন; যা টুইট করেন, তাই আদেশ। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের যে ‘ডিপ্লোমেসি’ নামক একটা জিনিস থাকে, সেটা তার অভিধানে নেই বললেই চলে। তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর নামে বিশ্ববাণিজ্য যুদ্ধ ডেকে আনেন, মিত্রদের সঙ্গেও বন্ধুত্বের বদলে হুমকি দেন, আর নিজের কথাকে ‘পরম সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। সমালোচকদের তিনি ‘ফেক নিউজ’ বলেন, আদালতের রায়কে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দেন। ২০২১ সালের ক্যাপিটল হিল হামলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন নেতা কীভাবে নিজের সমর্থকদের বিদ্রোহে উসকে দিয়ে পরে নীরব থাকতে পারেন?
ট্রাম্পের ‘অপ্রচলিত’ রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যে। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনি-ইসরায়েল শান্তি প্রক্রিয়ায় একটি ‘রেড লাইন’ লঙ্ঘন। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এটি প্রত্যাখ্যান করে, এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সতর্ক করে দেন এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে। ট্রাম্প এতটুকুও ভাবেননি যে পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য এটি কতটা সংবেদনশীল ইস্যু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে ছিল, তখন ট্রাম্প একক হাতে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়িয়ে দেন।
ইরানের ক্ষেত্রে তিনি কূটনীতিকে প্রথম অস্ত্র বললেও, হুমকি ও সামরিক শক্তির পূর্ণ ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘শক্তিশালী’ হামলার হুমকি দিয়ে যান এবং যখনই চেয়েছেন যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছেন। আবারও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ছড়িয়েছে, তেলের দাম বেড়েছে, আর পুরো বিশ্বকে তার এই ‘সিদ্ধান্তহীনতার খেলা’ দেখতে হয়েছে। তিনি ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি পর্যন্ত ‘সময় নষ্ট’ বলে উড়িয়ে দেন, অথচ নিজেই ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর নির্দেশ দেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি আরও বেশি ‘আন Inhibited’ এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা দেখান। ২০২৫ সালের ‘লিবারেশন ডে’-তে তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি মিত্রদের সঙ্গেও বন্ধুত্বের বদলে হুমকি দেন, নিজের কথাকে ‘পরম সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তাঁর এই কর্মকাণ্ড আমেরিকান গণতন্ত্রের জন্য এক ‘স্ট্রেস টেস্ট’। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, একটি পরাশক্তির নেতৃত্ব কতটা ‘দায়িত্বহীন’ হতে পারে, যদি সেটি একজন ব্যক্তির অহংকারের কাছে বিকিয়ে দেয়।
ট্রাম্প হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি—তবে অবশ্যই সবচেয়ে ‘বিনোদনমূলক’। শুধু দুঃখের বিষয়, এখানে বিনোদনের মূল্য দিতে হচ্ছে গোটা বিশ্বকে—যুদ্ধ, অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের মাধ্যমে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে একটি রিয়েলিটি শোতে পরিণত করেছেন, যেখানে প্রতিটি টুইট, প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীর জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ। একজন রাষ্ট্রনায়কের যে ‘স্থিতপ্রজ্ঞা’ ও ‘দূরদর্শিতা’ থাকা উচিত, তা তাঁর মধ্যে নেই; বরং তিনি আবেগ, আত্মম্ভরিতা এবং জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটেছেন। তাঁর এই ‘অপ্রচলিত’ শাসনশৈলী হয়তো কিছু সমর্থক পছন্দ করেন, কিন্তু বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু কখনো বাইরের শক্তি নয়, বরং অন্তর্দ্বন্দ্ব, অস্থিরতা এবং একজন অপ্রত্যাশিত নেতা, যিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন।
ট্রাম্প হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি—তবে অবশ্যই সবচেয়ে ‘বিনোদনমূলক’। শুধু দুঃখের বিষয়, এখানে বিনোদনের মূল্য দিতে হচ্ছে গোটা বিশ্বকে—যুদ্ধ, অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের মাধ্যমে।