
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আক্ষরিক অর্থেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তাবনা হতে পারে। বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এই আশঙ্কা করছি যে, আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে ইতিহাস হয়তো আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের সাক্ষী থাকবে।
গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত মৃতপ্রায়। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা—সবকিছুই ইঙ্গিত করছে যে এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত অনিবার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি শুধুই একটি আঞ্চলিক সংঘাত, নাকি এর পরিসর বাড়তে পারে?
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সংঘাতের পরিসর বাড়ার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি। কারণ, ইরান শুধু একটি দেশ নয়; এটি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ। ইতিমধ্যেই রাশিয়া ইরানকে অত্যাধুনিক সুখোই-৩০ যুদ্ধবিমান সরবরাহের চুক্তি করেছে, অন্যদিকে চীন ২৫ বছরের চুক্তির আওতায় ইরানে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে এই দুই শক্তিধর দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে নতুন একটি বৈশ্বিক যুদ্ধের সূচনা।
হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব আরও গভীর হচ্ছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রণালি তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিকে ‘আন্তর্জাতিক জলপথ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করছে। এই মনোভাব সংঘাতকে আরও উস্কে দিচ্ছে।
ইরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু ও দাফন রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে দুর্বল করছে। একটি দুর্বল সরকার সাধারণত বাইরের শত্রুর মুখে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে—এটি রাজনীতির চিরায়ত সত্য। তাই খামেনির পরবর্তী ইরানকে আরও বেশি উগ্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে। বাড়তি জ্বালানি মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে তার জনপ্রিয়তা কমছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি হয়তো একটি শক্তিশালী অবস্থান প্রদর্শন করতে চান, যার অংশ হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ। এই প্রতিযোগিতায় কে কাকে টপকে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্ব নেতাদের উচিত এখনই মাথা ঠাণ্ডা করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল একটি ছোটখাটো ঘটনা থেকে, যা শেষ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বকে গ্রাস করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও তেমনই শুরু হয়েছিল আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে। বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা সেই একই পথে এগোচ্ছে কি না, তা সময় বলে দেবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যদি পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখন আর কল্পনা নয়; এটি হতে পারে বাস্তবতা, যদি না আমরা সচেতন হই।
যুদ্ধের আগে কথা বলুন, কারণ কথার চেয়ে বোমা বেশি ক্ষতি করে। শান্তিই হোক শেষ সমাধান, আর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন কেবল ইতিহাসের পাতায়ই রয়ে যায়।
লেখক: শাহনুর আলম, চেয়ারপার্সন – পেট্রোরি ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন